মো. জয়নাল আবেদীন, কাউখালী ॥
দুই পাশে সারিবদ্ধ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা ফুল ছিটাচ্ছে একদল শিক্ষকের ওপর আর তাঁদের সম্মানে বাদ্যযন্ত্রে বাজতেছিলো সম্মান জানানোর সুর। আর এভাবেই ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিবার।
শনিবার সকাল ১০ টায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারে কার্যালয়ে উপজেলার ২১ অবসরপ্রাপ্ত বিদায়ী শিক্ষকদের প্রথমে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান ইউএনও। পরে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে র্যালির মাধ্যমে নেওয়া হয় উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে। সেখানে আগে থেকে ফুল নিয়ে শিক্ষকদের সম্মান জানাতে অপেক্ষা করছিলেন শতশত শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের আগমনে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানান বিদায়ী শিক্ষকদের।
কাউখালী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এজহার মিয়ার সভাপতিত্বে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী আতিকুর রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার ভূমি আওয়ালীন খালেক, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার শিবলী সফিউল্লাহ, পোয়াপাড়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, করুণাময় চাকমা, ঘাগড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুর্শে মারমাসহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীবৃন্দ।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাদের তালুকতার, ঘাগড়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শ্যামল মিত্র চাকমা, পোয়াপাড়া মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সাবেক প্রধান শিক্ষক অমরেন্দ্র রোয়াজা, বেতবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক খোরশেদ আলম, সহকারী শিক্ষক ক্যাথুয়াইপ্রু মার্মা, আবুল কাশেমসহ আরও অনেকে।
শিক্ষার্থীদের সমান শিক্ষার পরিবেশ পাওয়ার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের দাবি জানিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককরা বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহার সীমিতকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি বন্ধ করা, শিক্ষকদের ক্লাসে যাওয়ার পূর্বে প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে যাওয়া, শিক্ষক যে মর্যাদার পাত্র হয় এটিকে দৃশ্যমান করতে করা, প্রতিষ্ঠান প্রধানের চেয়ার খুব কঠিন, এটাকে মেইনটেইন করতে হবে, আপনাদের যোগ্যতা আছে, আপনাদেরকে চেষ্টা করতে হবে।
আলোচনা সভায় ঘাগড়া কলেজর প্রধান প্রাক্তন অধ্যক্ষ শ্যমল মিত্র চাকমা বলেন, প্রধান শিক্ষকের এখন প্রয়োজন প্রয়োগ, প্রশিক্ষণ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া, মনকে উদার করতে হবে, এলাকাকে আলোকিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াটা সঠিক হওয়া আবশ্যক। যেন অত্যন্ত যোগ্য লোক যেন নিয়োগ পান সে দিকে লক্ষ্য রাখার আহবান জানান তিনি।
কাউখালী সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আব্দুল কাদের তালুকদার বলেন- আমাদের সমস্যা হচ্ছে মেরুদন্ডে আর চিকিৎসা চলছে হাতপায়ে আর এক্ষেত্রে একই সমান বা সম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। জাতীয় আয়ের শতকরা ১৫ ভাগ শিক্ষা খাতে ব্যয় করছে সরকার। কাউখালীতে গত অর্থবছরে সেটি শতকরা ২৫ ভাগ করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি, এই ধারা অব্যহত রাখার অনুরোধ জানান তিনি।

এসময় শিক্ষকদের উদ্দেশে সাবেক শিক্ষকরা বলেন, না জেনে, কনফিউজড কোনও টপিক কোনওভাবেই শিক্ষার্থীদের পড়াবেন না। বিদ্যালয়ের বারান্দায় পায়চারি করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নোট বইয়ে পর্যবেক্ষণ লিখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে যথাযথ পরামর্শ প্রদান করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী আতিকুর রহমান বলেন- প্রাক্তন শিক্ষকবৃন্দ আমাদের সম্পদ, তারা তাদের দীর্ঘ চাকরিজীবনে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন আর আজ তাদের জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে শেয়ারের মাধ্যমে ভবিষ্যতের পথচলাকে সহজ করবে। আমরা প্রতিটি বিষয় নোট নিয়েছি, এগুলো পত্র আকারে পরবর্তীতে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেয়া হবে। তিনি এই আয়োজনে সবার সরব উপস্থিত থাকার জন্য এবং নিজেদের সম্পৃক্ত করায় সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
আলোচনা সভা শেষে সংবর্ধিত সকল শিক্ষককে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। একই সাথে দুপুরে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্ন ভোজের।
শেষে এসব শিক্ষকদের মাইক্রোবাস যোগে পুনরায় যার যার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। চাকুরি জীবনের সমাপ্তির দীর্ঘ সময় পর এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সংবর্ধনা পাওয়া বায়োবৃদ্ধ শিক্ষকরা।

