পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ পিসিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে শান্তিচুক্তির প্রাপ্তি, প্রত্যাশা ও পূনঃমূল্যায়ন বিষয়ক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য চুক্তি তার ২৮তম বর্ষপূর্তি অতিক্রম করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশিত শান্তি, সমতা ও টেকসই উন্নয়ন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই গভীর বাস্তবতার প্রেক্ষিতে, আমরা রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, নিরাপদ পরিবেশ, মানবাধিকার বাস্তবতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে একটি স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরতে চাই। দীর্ঘ দিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব পরিস্থিতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার একটি অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে কিছু প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী, যারা নিজেদের মানবাধিকারকর্মী, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের অবস্থান ও বক্তব্য অনেক সময়ই একতরফা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের বক্তব্যে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধ প্রায় অনুল্লেখিত; বরং তারা এমন ন্যারেটিভ তৈরি করে যা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেখায় এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপরাধকে পরোক্ষভাবে আড়াল করে। শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল সম্প্রীতি, উন্নয়ন, এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর একপেশে প্রচার ও মতাদর্শিক অবস্থানের কারণে বাস্তব অগ্রগতি বহু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
পিসিসিপির আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে জেএসএস (সন্তু লার্মা গ্রুপ), ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) এবং কেএনএফের দীর্ঘস্থায়ী সন্ত্রাসী তৎপরতা। অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা, গ্রাম পোড়ানো, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভেদ তৈরির চেষ্টা, এইসব কর্মকাণ্ড পাহাড়ের মানুষের জীবনকে জিম্মি করে রেখেছে। কেএনএফের সঙ্গে উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠনের যৌথ প্রশিক্ষণের মতো ঘটনা স্থানীয় নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তবুও কিছু তথা-কথিত মানবাধিকার কর্মী ও সিভিল সোসাইটি সদস্য এসব গুরুতর অপরাধ সম্পর্কে দীর্ঘদিন নীরব থাকছেন। এই বেছে নেওয়া নীরবতা উদ্দেশ্যমূলক, এবং তা বিভাজন সৃষ্টিকারী শক্তির অবস্থানকে শক্তিশালী করে। আমরা আমাদের পেশাদার সাংবাদিক সমাজের কাছে অনুরোধ করছি, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্টিং ও আলোচনার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড, অপতৎপরতা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তার উপর তাদের প্রভাব সম্পর্কেও সমান গুরুত্ব দেয়ার জন্য। বহু ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের অপরাধমূলক কার্যকলাপ সম্পর্কে নীরবতা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কেন এসব সত্য গোপন করা হয়? এবং কেন নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহারের মতো দাবি তোলা হয়?এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা বিশ্বাস করি-পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার, সমান সুযোগ এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, চাক, খুমি, খিয়াং এবং বাঙালি-সবাই শান্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন চায়। এগুলো কোনো গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার নয়; এগুলো বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সম্প্রতি বিদেশে কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্ণনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেমন “Rape as weapon “, “Occupation”, “State-sponsored violence”-যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের ওপর সরাসরি আঘাত। এই ধরনের বয়ান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপরাধকে আড়াল করে এবং শান্তিচুক্তির অগ্রগতিকে দুর্বল করে। আমরা এসব বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। সবশেষে, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানাতে চাই-আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে
শান্তি, নিরাপত্তা, সমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান চাই; সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই; পাহাড়ি-বাঙালি-সব নাগরিকের সমান অধিকার চাই; এবং আমরা বিভাজনমূলক রাজনৈতিক প্রচারণার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করবো। পার্বত্য চট্টগ্রাম কারো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অঞ্চল নয়-এটি বাংলাদেশের সকল নাগরিকের, এবং এটি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সর্বোপরি, বর্তমান বাস্তবতায় পার্বত্য শান্তিচুক্তি’র পুনঃমূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
এসময় পিসিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি রাসেল মাহমুদের সভাপতিত্বে ও পিসিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক, রিয়াজুল হাসানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ, বিশেষ অতিথি ছিলেন, স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টির আহবায়ক জিয়াউল হক, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের উপদেষ্টা ও পিসিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আহমেহ রাজু, বান্দরবান জর্জ কোর্টের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট জয়নাল আবেদিন ভুইয়া, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বিজেপির সাংগঠনিক সম্পাদক,মো: ইলিয়াস মাতাব্বর, ছাত্র অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় সাবেক সহ সভাপতি কাওছার আলী, পিসিসিপি ঢাকা মহানগর এর সহ-সভাপতি আল আমিন প্রমুখ।(বিজ্ঞপ্তি)

