ইয়াছিন রানা সোহেল॥
পার্বত্য চট্টগ্রাম চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই, খিয়াং, খুমি, পাংখোয়া, বম ও চাক সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং উৎসব-পার্বণ। উদাহরণস্বরূপ, চাকমাদের বিজু উৎসব, মারমাদের সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসব তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবগুলো তাদের কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক বন্ধনকে প্রতিফলিত করে। হস্তশিল্প, যেমন- চাকমাদের বুনন শিল্প, মারমাদের বাঁশ ও বেতের কাজ, এবং ত্রিপুরাদের নিজস্ব বয়নশৈলী এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ দিক। এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য এই অঞ্চলকে পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এখানকার উচুঁ নিচু অসংখ্য পাহাড়, ছোট-বড় নদী, কৃত্রিম হ্রদ, মায়াবী ঝরণাধারা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল পর্যটকদের আকর্ষণের অত্যমত স্থান। তবে পর্যটকদের আচরণ কখনো কখনো স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করে।
পর্যটন একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে আসে তেমনই অন্যদিকে যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করা হয়, তবে তা স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আসা পর্যটকদের কিছু নির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

১. স্থানীয় ঐতিহ্য ও রীতিনীতির প্রতি সম্মান: প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য ও রীতিনীতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিহারগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে টুপি, ঘোমটা, বোরকা ও জুতা খুলে প্রবেশ করা। নির্দিষ্ট স্থানে কথা বলা বা উচ্চস্বরে হাসা নিষেধ থাকতে পারে। পর্যটকদের উচিত স্থানীয় গাইড বা স্থানীয়দের কাছ থেকে এসব বিষয়ে জেনে নেওয়া এবং সে অনুযায়ী আচরণ করা।
রাঙামাটি রাজবন বিহার উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সহ সভাপতি প্রবীণ শিক্ষাবিদ নিরুপা দেওয়ান বলেন, ‘কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে পর্যটকদের উচিত সেখানকার ভৌগলিক অবস্থা, ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি সম্পর্কে স্টাডি করা। সেই হিসেবে নিজের আচরণ সংযত রেখে চলা। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ পর্যটক এসব ধারণা না নিয়েই ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। যেহেতু পার্বত্যাঞ্চলে বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন ভাষাভাষির লোকজনের বসবাস। সুতরাং এখানে পর্যটকদের এসব বিষয় জেনেই আসা উচিত বলে মনে করি। রাজবন বিহারে লেখা আছে, মাথায় টুপি দেয়া, বোরকা ও ঘোমটা দিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। তবুও কিছু পর্যটককে দেখা যায়, এসব খেয়ালই করেন না। এটা ঠিক না। আমরা যখন ভারতের আজমীর শরীফে গিয়েছিলাম সেখানে আমাদেরকে মাথায় কাপড় দিয়ে ঢুকতে বলা হয়েছিল। আমরা সেভাবেই গিয়েছিলাম। এটা হচ্ছে অন্যের ধর্মের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। যারা এসব করেন না তারা অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তাই পার্বত্যাঞ্চলে বেড়াতে আসা পর্যটকদের উচিত এখানকার ভৌগলিক অবস্থা, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি ধারণা নিয়েই ঘুরতে আসা। আর এতে করে পর্যটকদের প্রতি স্থানীয়দের শ্রদ্ধাবোধটা আরো বাড়বে বলে মনে করি।
২. পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পর্যটকদের উচিত পরিবেশ দূষণ না করা, যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলা, এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো। স্থানীয় বনভূমি, নদ-নদী এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। রাঙামাটির সবচেয়ে বড় ঝরণা বিলাইছড়ি উপজেলার ধুপপানি ঝরণা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে যেতে হয়। স্থানীয় যুবক অরিন্দম চাকমা পর্যটকদের ঝরণায় আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে সঙ্গ দেয়।
অরিন্দম চাকমা জানায়, দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ঝরণা দেখতে আসেন বলে তাদের কষ্টের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ঝরণায় নিয়ে যাই। ঝরণায় ছবি তোলা, গোসল করা, নাচানাচি করে পর্যটকরা। দেখে ভালোই লাগে। কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি প্লাস্টিকের বোতল, চিপস, কলার খোসা এসব ঝরণার আশেপাশে ফেলে। পর্যটকদের উচিত এসব বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হওয়া। ট্যুরিস্ট বোট মালিক সাগর ওয়াহিদ বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী সকল বোটে বিন থাকে। পর্যটকদের বলা হয়, খালি বোতল, প্লাস্টিক ও আবর্জনা ঝুড়িতে ফেলতে। কিন্তু অধিকাংশই তা কর্নপাতই করেন না।’

৩. পোশাক ও ব্যক্তিগত আচরণে সংবেদনশীলতা: পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অভ্যস্ত এবং রক্ষণশীল সংস্কৃতি অনুসরণ করে। পর্যটকদের উচিত শালীন পোশাক পরিধান করা এবং স্থানীয় রীতিনীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। বিশেষ করে ধর্মীয় স্থান বা ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে প্রবেশের সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকা উচিত।
পর্যটনের উদ্যোক্তা রাইন্যা টুগুন রিসোর্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ললিত সি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে আসা পর্যটকদের আচরণ হওয়া উচিত এখানকার অধিবাসীদরে সংস্কৃতি ও পরিবেশবান্ধব। এখানকার মানুষের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ধ্যান ধারণা ও খাদ্যাভ্যাসের প্রতিও চাই ব্যাপক সংবেদনশীলতা। পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে চাই বাড়তি সতর্কতা। রাঙামাটি হ্রদে কোন প্রকার বর্জ্য ফেলানোর আগে ভাবতে হবে শতবার।
৪. ছবি তোলা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা: অনেক পর্যটক স্থানীয়দের ছবি তোলার বিষয়ে অত্যুৎসাহী হন। তবে, ছবি তোলার আগে অবশ্যই অনুমতি নেওয়া উচিত। কিছু সম্প্রদায় ছবি তোলাকে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন মনে করতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি বা শিশুদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব রাঙামাটি (টোয়ার) প্রেসিডেন্ট ও গরবা ট্যুরিজমের স্বত্তাধিকারী বাদশা ফয়সালের মতে, ‘রাঙামাটি তথা পাহাড়ের পর্যটন শিল্প বিকশিত হতে হলে কয়েকটা পয়েন্টের কথা আমি সবসময়ই বলে আসছি। টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে ঞড়ঁৎরংস ইবযধারড়ঁৎ জানতে ও জানাতে হবে। যারা সার্ভিস প্রোভাইড করবেন তাদের নিজেদের যেমন জানতে হবে আর যারা সার্ভিস নিবেন অর্থাৎ ট্যুরিষ্টদেরও ভ্রমণকালীন স্থানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লাইফস্টাইল (খাদ্যাভ্যাস, পোষাক, ভাষা, ধর্ম, মতাদর্শ ইত্যাদি….)’র প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। সম্মানজনক মনোভাব ধারনের মাধ্যমেই ট্যুরিজমে সম্প্রীতির সূচনা হয়। কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে কিছু নিয়ম-নীতি থাকবে পর্যটকগণ তা মেনে চলবেন। পর্যটন স্টেইকহোল্ডারদের জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নাই। এখানকার অধিবাসীদের পোষাক, লাইফ স্টাইল দেখে পর্যটকরা ছবি তুলতে চাওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমতি নিয়েই ছবি তুলতে হবে।’

৫. স্থানীয় অর্থনীতিকে সমর্থন: স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার ক্রয় করে পর্যটকরা সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। এতে স্থানীয় কারিগর ও ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হন এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য হয়। তবে, ন্যায্য মূল্যে পণ্য ক্রয় করা উচিত এবং দর কষাকষি করার সময় স্থানীয়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।
বয়ন টেক্সটাইলের সত্ত্বাধিকারী জহির উদ্দিন বলেন, পর্যটকদের আমরা যথেষ্ট সম্মান করে পণ্যের দাম বলি। কিছু পণ্যের গায়ে একদাম লিখে দিই। তারপরেও কিছু পর্যটক এমনভাবে দরদাম করে মনে হয় যেন ঢাকা-চট্টগ্রামের ফুটপাতের পণ্য ক্রয় করছে। অবশ্য তাদের এসব পণ্যের উৎপাদনে খরচ এবং গুনগত মান সম্পর্কে ধারণা নেই বলেই এভাবে দর কষাকষি করে। তবুও আমরা সম্মানের সাথে তাদের সাথে আচরণ করি। মৌসুমী ফল ব্যবসায়ী মোঃ সোহেল, অভয় চাকমা ও সঞ্চয় ত্রিপুরা বলেন, ‘অনেক পর্যটক আনারস, আম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, কমলা ইত্যাদি কেনার জন্য আগ্রহ নিয়ে আসেন। তাদের আগ্রহকে আমরা সম্মান করি এবং যতটুকু পারি দাম কমিয়ে রাখার চেষ্টা করি। তারপরেও কিছু কিছু পর্যটকের সাথে দরদাম নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়। এটা তাদের না বুঝার কারণেই করে থাকেন বলে মনে করি।’
৬. সংঘাতপূর্ণ ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতা: পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সংঘাতপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে। পর্যটকদের উচিত এই সংবেদনশীল বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিষয়াদিতে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরী।
দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়২৪ ডটকম-এর সম্পাদক ফজলে এলাহী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল পর্যটন এলাকা। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। যাদের রয়েছে বর্ণিল সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র জীবন। এখানে যারা বেড়াতে আসবেন। তাদের স্বভাবতই এসবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। এটাই পর্যটকদের দায়িত্বশীলতা। এই দায়িত্বশীলতাটুকু স্থানীয়রা আশা করতেই পারে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পর্যটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মোঃ হাবীব আজম বলেন, সারাবছরই পার্বত্যাঞ্চলে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এখানকার ভাষা, সংস্কৃতি সবই আলাদা। অধিকাংশ পর্যটকের মাথায় এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকে। জেলা পরিষদের উদ্যোগে পর্যটনের উন্নয়নে বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার যেমন বিভিন্ন বাহনের (বাস,সিএনজি অটোরিক্সা,কার, মাইক্রো প্রভৃতি) চালক-হেলপার, হোটেল-মোটেল, টেক্সটাইল, রেস্টুরেন্টে কর্মরতদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। একইসাথে আধুনিক মানের প্রচারপত্র তৈরি করে বিলি করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচার করা হবে। এর ফলে পর্যটকরা কিছুটা ধারণা পাবেন। তবে যত যা’ই করি না কেনো। পর্যটকদের সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করেন এই জনপ্রতিনিধি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পকে টেকসই করতে হলে পর্যটকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পর্যটন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, গাইড এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল পর্যটন নীতির প্রচারে সক্রিয় হতে হবে। স্থানীয় সম্প্রদায়কে পর্যটন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা এবং তাদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত করা জরুরি।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়২৪ ডটকম।

