আরমান খান
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির দুর্গম এক গ্রাম থেকে নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখা অদম্য ইচ্ছা ও স্বপ্নকে সত্যি করলেন মুক্ত চাকমা। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেলেন অদম্য মেধাবী এই শিক্ষার্থী। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৫ না পেয়ে ভেঙ্গে পড়লেও তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দিনরাত কঠোর পরিশ্রমের ফলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর স্বপ্ন পূরণে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে। এমন সাফল্যের পেছনে সর্বত্র সাহস জুগিয়েছে প্রিয় শিক্ষক ও কৃষক বাবা-মা।
মুক্ত চাকমা রাঙামাটির লংগদু উপজেলার দুর্গম বগাচত্বর ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষক দম্পতি প্রভু রঞ্জন চাকমা ও সুবলিকা চাকমার একমাত্র পুত্র। তিন বোনের একমাত্র ভাই মুক্ত চাকমা। শৈশবে স্কুল শুরু হয় স্থানীয় উগলছড়ি মহাজনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০১৭ সালে এখান থেকে পঞ্চম শ্রেনির সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় এবং সাধারণ বৃত্তি লাভ করে। এরপর উগলছড়ি মহাজনপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পায় অদম্য মেধাবী মুক্ত চাকমা। এবার গ্রাম ছেড়ে পাহাড় ছেড়ে শহরের কলেজে ভর্তি হতে চট্টগ্রামে পাড়ি জমান। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এন্ড কলেজে। গেল বছর এখান থেকেই জিপিএ ৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে স্বপ্নের পথে পা বাড়ান মুক্ত চাকমা।
প্রত্যান্ত পাহাড়ি গ্রাম থেকে প্রথম একজন মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে নিজের অনুভুতি আমাদেরকে জানান মুক্ত চাকমা। তিনি বলেন, ‘রাঙামাটি জেলার অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের ওখানকার পরিবার বা পাড়া-মহল্লায় সচরাচর ছেলে-মেয়েদের মেডিকেল, বুয়েট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা শোনা যেত না। এমনকি ছোটবেলায় আমি বা আমার পরিবারের কেউ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখতাম না। এমন একটি প্রতিকূল পরিবেশ থেকে মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখাটা সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। মূলত আমার নিজের প্রবল ইচ্ছা আর জেদ এবং পরিবারের সমর্থন আমাকে এই স্বপ্নের পথ দেখিয়েছে। যেদিন ভর্তি ফলাফল পাই প্রথমেই বাবা মাকে ফোনে জানাই। সেদিন মা আমার খুশিতে চোখের জল ফেলেছে আর বলেছে আমার ছেলে ডাক্তার হবে অনেক বড় ডাক্তার।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় এতদূর আসা বলে জানান মুক্ত। মুক্ত চাকমা বলেন, ‘স্কুলের সকল স্যার ম্যামরা পড়ানোর ফাঁকে জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা নিয়ে আলোচনা করতেন। বিশেষ করে হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আরিফ স্যার ও নীরব স্যার ছিলেন আমার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। ক্লাসে যখন মেডিকেল, বুয়েট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা করতেন এবং কেন উচ্চশিক্ষা ও মানবসেবা প্রয়োজন তা বোঝাতেন, তখন থেকেই আমার ভেতরে সুপ্ত বাসনাটি দানা বাঁধে। আমি মনে মনে ঠিক করি, আমাকেও একজন চিকিৎসক হতে হবে। দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করতে হবে।’
মুক্ত চাকমা আরো বলেন, ‘মেডিকেলে চান্স পাওয়াটা এত সহজ ছিল না। শুনেছি এসএসসি ও এইচএসসি দুইটাতে জিপিএ ৫ পেলে চান্স পাওয়া সহজ হয়। আমাদের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আমাদের আগে কেউ জিপিএ ৫ পায়নি। তাই জিপিএ ৫ পাওয়া সহজ ছিল না। জিপিএ ৫ পেতে সর্বোত্তম সাহায্য করে আমার জীবনের নির্মাতা জিতন নীরব স্যার। আর আমার পরিশ্রম তো রয়েছে। স্যারকে আমি সব সময় কাছে পেয়েছি। কলেজের সম্মানিত স্যার এবং আমার প্রাইভেট শিক্ষক জয়ন্ত (চুয়েট শিক্ষার্থী) ভাইয়ার সহযোগিতায় এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পাই। এরপর ভর্তি হই রেটিনা মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কোচিং সেন্টারে। কোচিংয়ে ভাইদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং বাবা মায়ের দোয়া আশীর্বাদে মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই।’
নিজের একমাত্র পুত্রের এমন সাফল্যে গর্বিত পিতা প্রভু রঞ্জন চাকমা ও মাতা সুবলিকা বলেন, “আমরা সাধারণ জুমচাষি। কোনো রকম চাষাবাদ করে জীবন চালাই। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছি। ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে, মেডিকেলে ভর্তি হতে পেরেছে এতেই আমরা অনেক খুশি। আপনারা দোয়া করবেন, আমাদের ছেলে যেন বড় মানুষ হতে পারে।”
মুক্ত চাকমার হাতেখড়ি সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোমিনুল হক বলেন, মুক্ত শৈশব থেকেই অত্যন্ত ভদ্র ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী ছিল। সে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে আমাদের বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জল করেছে। পুরো ইউনিয়নে সেই প্রথম মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এটা আমাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রেরণা হয়ে থাকবে।
যে শিক্ষককে মুক্ত চাকমা নিজের জীবনের নির্মাতা বলে সম্বোধন করেছেন, সেই মহান শিক্ষক জীতন বড়ুয়া নীরব বলেন, উগলছড়ি মহাজন পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রথমবারের মতো সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ লাভ করেছে ২০২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী মুক্ত চাকমা। এই সাফল্যের মাধ্যমে সে শুধু নিজ পরিবার নয়, উগলছড়ি মহাজন পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, বগাচতর ইউনিয়ন, রাঙ্গামাটি জেলা তথা লংগদু উপজেলাবাসী সবাইকে গর্বিত করেছে।
মুক্ত চাকমা উঠে এসেছে একেবারে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল থেকে—যেখানে আজও বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। সৌর বিদ্যুতের অল্প আলোতেই দিনের পর দিন পড়াশোনা করে সে আজ সরকারি মেডিকেলে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছে। এই বাস্তবতা তার সংগ্রাম, ধৈর্য ও অদম্য মানসিকতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
গুণী এই শিক্ষক আরো জানান, ‘এই অসাধারণ অর্জনের পেছনে রয়েছে তার পিতা-মাতার অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও দোয়া, এবং উগলছড়ি মহাজন পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ আরিফুল হাছান চৌধুরী স্যার–এর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সাহসী সিদ্ধান্ত ও আন্তরিক উদ্যোগ। মুক্ত চাকমা ছিল একজন অত্যন্ত অনুগত ও শৃঙ্খলাবান ছাত্র। নীরব স্যার যা বলতেন, সে তা নিষ্ঠার সাথে পালন করত। তার পরিবারও সবসময় বলতেন‘স্যার, আপনি যা বলেন, সেটাই হবে।’এই অটুট বিশ্বাস ও ভরসাই হয়তো তাকে আজ এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
উগলছড়ি মহাজনপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফ হাসান চৌধুরী বলেন, “মুক্ত চাকমার এমন সাফল্য আমাদের সবার মুখ উজ্জল করেছে। বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমরা চাই শিক্ষার্থীদের মেধার যথাযথ বিকাশ ঘটাতে। এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে আরো ভালো ফলাফল করবে এবং উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যানে কাজ করবে এটাই শিক্ষক হিসেবে আমার একমাত্র চাওয়া।”

