শংকর হোড় ॥
সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদে পর্যটকের নৌকাডুবির ঘটনায় রাঙামাটি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘটনা তদন্তে নৌ পুলিশের ইন্সপেক্টরকে আদেশ প্রদান করেছেন। মঙ্গলবার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আলম চৌধুরীর আদালত এই আদেশ প্রদান করেন।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ পর্যালোচনায় ও বিশ্লেষণে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়, কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের বৃহত্তম ও এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ। প্রতি বছর পার্বত্য রাঙামাটি জেলা ও কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লক্ষ পর্যটকের আগমন ঘটে। এবং তারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন ধরনের নৌকায় চড়ে কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ পর্যটক এর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তপক্ষ, সরকারি-বেসরকারি পর্যটন রিসোর্টগুলোর চরম উদাসীনতা ও গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়। যা থেকে সংবিধানের ৩২ ধারায় উল্লেখিত জীবন রক্ষার অধিকার, ঞযব চবহধষ ঈড়ফব ১৮৬০ এর ৩০৪(খ)/৩৩৬/৩৩৭ ধারা, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন অধ্যাদেশ, ১৯৭৬, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড আইন, ২০১০ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী শান্তিযোগ্য অপরাধ এবং ভবিষ্যতে এ থেকে আরো অপরাধ উদ্ভুত হতে পারে।
এই ঘটনা থেকে আদালত আরো পর্যবেক্ষণ করে যে, কাপ্তাই হ্রদে মারাত্মক নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে ১৯ জন পর্যটক (যার মধ্যে ৪ জন শিশু) অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, উক্ত ঘটনায় একটি সাধারণ সূত্র লাইফ জ্যাকেটের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। রিসোর্ট মালিক, নৌকা মালিক ও পরিচালকরা পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি চরম উদাসীনতা ও অবহেলা প্রদর্শন করছেন। রাঙামাটি পর্যটন ঘাটের ম্যানেজার ফখরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ক্যাপাসিটি ও লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করেন। কিন্তু ২৫ ডিসেম্বরের ঘটনায় ১৯ জন পর্যটকের কেউই লাইফ জ্যাকেট পরিধান করেননি, যা প্রমাণ করে যে মনিটরিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। রাঙামাটি ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে তারা পর্যটকদের ‘নিরুৎসাহিত’ করছেন, কিন্তু নিরুৎসাহিতকরণ যথেষ্ট নয়; আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), নৌ পুলিশ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ কাপ্তাই হ্রদে নিয়মিত মনিটরিং ও পরিদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কায়াকিং, স্পিডবোটিং এবং অন্যান্য অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট নিরাপত্তা নীতিমালা বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নেই। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। জনস্বার্থে, পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তা বিধান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রয়োজনীয় আইনী পদক্ষেপ নেয়া অপরিহার্য বলে আদেশে বলা হয়।
আদালতের আদেশে বলা হয়, উপরোক্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৯০(গ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আদালত নৌ পুলিশ ইন্সপেক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি উক্ত নৌ-দুর্ঘটনায় নৌকার মালিক ও চালকের কোনরূপ অবহেলা ছিল কিনা, নৌকার বৈধ রেজিস্ট্রেশন/লাইসেন্স ছিল কিনা, নৌকায় ১৯ জন যাত্রীর জন্য পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্ছাম ছিল কিনা, যাত্রী সংখ্যা নৌকার নির্ধারিত ধারণক্ষমতার মধ্যে ছিল কিনা, চালক প্রশিক্ষিত ও বৈধ লাইসেন্সধারী ছিলেন কিনা, চালকের অদক্ষতা বা অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে কিনা এবং কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী কতটি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নৌ-যান আছে এসব বিষয়ে তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
তদন্তে সার্বিক সহায়তা প্রদান করার জন্য পুলিশ সুপার, ট্যুরিস্ট পুলিশ, রাঙামাটি ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, রাঙামাটিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।
জিআর আমলি আদালতের-১ জেনারেল রেজিস্ট্রার অফিসার(জিআরও) এএসআই তাজ উদ্দিন আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে কাপ্তাই হ্রদে সুবলং থেকে ফেরার পথে সুবলং চ্যানেলের শিলছড়িমুখ এলাকায় ১৯ পর্যটক বোঝাই একটি ট্যুরিস্ট বোট হঠাৎ উল্টে গিয়ে যাত্রীরা সবাই পানিতে ডুবে যায়। বোটে থাকা পর্যটকদের চিৎকারে আশপাশের কয়েকটি নৌযান দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যায়। উদ্ধার করে নারী, শিশুসহ সব পর্যটককে।

